ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। তাঁর মূল নাম আবুল ফয়েজ মুহাম্মদ খালিদ হোসেন। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক। শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও বক্তৃতা—সব জায়গায় আছে তাঁর সার্থক পদচারণ।
কর্মজীবনে ওমরগণি এম.ই.এস. কলেজের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এ ছাড়া এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের খণ্ডকালীন অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের কোরআনিক সায়েন্সেস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অতিথি শিক্ষক ছিলেন। বিশ্ব মুসলিম লীগের মুখপাত্র দ্য ওয়ার্ল্ড মুসলিম লীগ জার্নালসহ বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর দুই শতাধিক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত ইসলামী বিশ্বকোষ দ্বিতীয় সংস্করণের ৩ থেকে ৯ খণ্ড ও সিরাত বিশ্বকোষ সম্পাদনা করেছেন।
তিনি বলেন , দেশমাতৃকার একটি ক্রান্তিলগ্নে দেশ ও জাতির প্রয়োজনে কিছুটা ভূমিকা রাখার যে সুযোগ পেয়েছি, এটা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যের বিষয় বলে আমি মনে করি।
এই দায়িত্ব অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, তবে আনন্দও আছে। আমি আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা করে যাচ্ছি। সব কিছু মিলিয়ে ভালো লাগছে।
তিনি আরও বলেন , আমার দায়িত্ব পালনের এক বছর পার হয়েছে। এক বছর সময় বড় কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। তার পরও এ সময়ে উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে। বিশেষ করে একটি সফল হজ ব্যবস্থাপনা জাতিকে উপহার দিতে পেরেছি। সাশ্রয়ী হজ প্যাকেজের মাধ্যমে ৮৭ হাজারের বেশি হজযাত্রীকে হজ পালন করাতে পেরেছি। এ মন্ত্রণালয়ে রাজস্ব খাতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ছোট ক্যাটাগরি হতে মধ্যম ক্যাটাগরিতে উন্নীতকরণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছে। নেপালের লুম্বিনীতে ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বৌদ্ধ কমপ্লেক্স নির্মাণকাজ শুরু হতে যাচ্ছে। ওয়াকফসংক্রান্ত চলমান মামলা শুনানির জন্য হাইকোর্টে একটি স্বতন্ত্র বেঞ্চ গঠন করা সম্ভব হয়েছে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের আধুনিকায়ন, সৌন্দর্যবর্ধন ও উন্নয়নে ১৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আরো বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
হজ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় প্রতিবছর একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করে থাকে। এই রোডম্যাপ অনুযায়ী হজ ব্যবস্থাপনার সব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়। আমরা শুরু থেকেই এই রোডম্যাপ অনুসারে সব কার্যক্রম সম্পাদনের বিষয়ে তৎপর ছিলাম। কোনো ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আগেই আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এর ফলে এ বছরের হজ ব্যবস্থাপনা সাবলীল ও মসৃণ হয়েছে।
এ দেশে হজ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। এর মধ্যে একটি অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো হজযাত্রীদের অসচেতনতা। অনেকেই কোনো হজ এজেন্সির মাধ্যমে হজে যাচ্ছে, হজ প্যাকেজে কী ধরনের সেবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, প্যাকেজ মূল্য কত—এসব বিষয় না জেনেই দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে হজের নিবন্ধন করে থাকেন। অনেকে কোনো ধরনের ডকুমেন্ট ছাড়াই অর্থ লেনদেন করেন। এজেন্সির সঙ্গে হজযাত্রীরা লিখিত কোনো চুক্তিও করেন না। পরবর্তী সময়ে এজাতীয় বিষয়গুলো নিয়ে নানাবিধ সংকট তৈরি হয়। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে হজের খরচ বেড়ে যায়, হজযাত্রীরা প্রতিশ্রুত সেবা পান না। কিছু হজ এজেন্সিও আছে—যাদের সেবা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ ছাড়া আমাদের দেশের মুসলমানদের মধ্যে বয়োবৃদ্ধ হওয়ার পর হজ পালনের প্রবণতা লক্ষণীয়। অনেকে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার পরও তথ্য গোপন করে হজ করতে যান। এ বিষয়গুলো সুশৃঙ্খল হজ ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রতিবন্ধক।
মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালাকে যুগোপযোগী করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং এ কমিটি বেশ আগেই কাজ শুরু করেছে। আশা করছি, এ মাসের মধ্যেই এটি চূড়ান্ত হবে এবং আমরা এটিকে গেজেট আকারে প্রকাশ করতে পারব।
মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০০৬-এর ১২(৪) অনুচ্ছেদে মসজিদ পরিচালনা কমিটিতে সংশ্লিষ্ট মসজিদের প্রধান ইমামকে সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনীত করা যেতে পারে—এরূপ একটি বিষয় বর্ণিত আছে। তবে তাঁকে মনোনীত করতেই হবে—এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আমি মনে করি, ইমামরা সমাজের অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। মসজিদ পরিচালনা কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে থাকার সঙ্গে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি-হ্রাসের কোনো সম্পর্ক নেই। তার পরও এ বিষয়ে আমরা চিন্তা-ভাবনা করেই সিদ্ধান্ত নেব।
মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য একটি বেতনকাঠামো প্রণয়ন করা হবে। আমরা এরই মধ্যে মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা যুগোপযোগী করার কাজে হাত দিয়েছি। এই নীতিমালাতেই ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য একটি বেতন স্কেল সুপারিশ করা হবে এবং এটি অনুসারে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হবে। এর ফলে মসজিদের ধরন অনুযায়ী ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতনকাঠামোতে ইউনিফর্মিটি আসবে। এ ছাড়া ইমাম-মুয়াজ্জিনদের চাকরির নিশ্চয়তা বিধান হবে।
আমরা বিগত সরকারের আমলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীরকে এ তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে। এ কমিটি এরই মধ্যে কাজও শুরু করেছে। আশা করছি এ কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে পারবে এবং এ প্রতিবেদন পেলে আমরা সেটা জাতির সামনে উন্মোচন করব।
কওমি মাদরাসা সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি এককভাবে আমার মন্ত্রণালয়ের কোনো বিষয় নয়। ২০১৭ সালে কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) ডিগ্রিকে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সমমান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে এসএসসি, এইচএসসি ও স্নাতক ডিগ্রির অনুরূপ কওমি মাদরাসার কোনো সনদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এ কারণে তাকমিলের বাস্তবায়ন করাটা অত্যন্ত দুরূহ। তার পরও আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। এরই মধ্যে কওমি অঙ্গনের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের সঙ্গে নিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গেও বৈঠক করেছি, আরো বৈঠক হবে। আমার আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই, শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যাব, ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন , বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের আধুনিকায়ন, সৌন্দর্যবর্ধন ও উন্নয়নের জন্য একটি প্রকল্প রয়েছে। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের অনুকূলে ১৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে এই কাজটি শেষ করতে পারলে ভালো লাগবে। বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনাকে আমি একটি মডেল হিসেবে দাঁড় করাতে চাই। ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়কে ডিজিটাইজেশনের আওতায় আনয়ন, বেহাত হওয়া ওয়াকফ এস্টেট পুনরুদ্ধার, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের কল্যাণার্থে বিশুদ্ধ পানীয়জলের প্লান্ট স্থাপন ও চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লাহ শাহি জামে মসজিদের পুনর্নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করে যেতে চাই। এ ছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে একটি গতিশীল, কার্যকর ও ফলপ্রসূ প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপ দেওয়ার ব্যাপারে আমার বিশেষ আকাঙ্ক্ষা আছে।
মন্তব্য করুন