‘আপোষহীন, আত্মমর্যাদা ও গণতন্ত্রের প্রতীক এক নেত্রীর প্রস্থান’ - সমকন্ঠ
রবিবার , ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সমকন্ঠ
১৩ জানুয়ারী ২০২৬, ৮:৩০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

‘আপোষহীন, আত্মমর্যাদা ও গণতন্ত্রের প্রতীক এক নেত্রীর প্রস্থান’

  • ওয়াশিংটনে খালেদা জিয়ার স্মরণসভায় কূটনীতিক, সাংবাদিক ও নীতি নির্ধারকরা

যুক্তরাষ্ট্রের শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলেন ওয়াশিংটনের কূটনীতিক, সাংবাদিক ও নীতি নির্ধারকরা। তাঁর প্রয়াণে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানাতে আয়োজিত এই সভায় বক্তারা বেগম জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ন‍্যাশনাল প্রেসক্লাবের সদস‍্য ও মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারীর আয়োজনে এই স্মরণসভায় বক্তব্য রাখেন প্রেসক্লাবের নবনির্বাচিত ১১৯তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে মার্ক শেফ, এপি’র সাবেক সম্পাদক ম‍্যারন বিলকাইন্ড, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড‍্যান মোজেনা ও রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট, স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো স্টিভ রোজ, ভয়েস আমেরিকা বাংলা বিভাগের প্রাক্তন প্রধান ইকবাল বাহার চৌধুরী, বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মুর্তজা ও আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক এহতেশামুল হক।

স্বাগত বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী বলেন, ‘আমরা শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করছি তা নয়, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রটেক্টর এবং অর্থনৈতিক প্রগতির নির্মাতা।
যখন দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং বিরোধী মতের কণ্ঠ রুদ্ধ, তখন তিনি নির্ভীক চিত্তে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্বে নজির সৃষ্টিকারী এক অনন্য নেতা।

তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার সাহসের উৎস ছিল ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র সরানোর উদ্যোগে তিনি বাধা দেন। স্বামী মেজর জিয়াউর রহমানের অনুমতি ছাড়া অস্ত্র সরানো যাবে না, এই দৃঢ় অবস্থানের মধ্য দিয়েই তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিরোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।

তিনি আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য অন্যায়ভাবে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত মুশফিক বলেন, এই হয়রানীমূলক মামলার বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে প্রতিবাদ হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্টে একে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়।

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মজেনা বলেন, বেগম খালেদা জিয়া অন্যকে সম্মান দিয়ে নিজেও সম্মানিত হতেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি অন‍্যদের খোঁজখবর নিতেন। গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে উল্লেখ করেন তিনি। রাষ্ট্রদূত মোজেনা বলেন, রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সবসময় আমার প্রতি আন্তরিক ছিলেন এবং যখনই চেয়েছি তার সাথে কথা বলতে পেরেছি।
রাষ্ট্রদূত ডেন মজেনা বলেন, আপনি (মুশফিক) এখানে বাংলাদেশের ইতিহাসের কিংবদন্তি খালেদা জিয়াকে স্মরণ করার জন্য সবাইকে একত্রিত করায় আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বাংলাদেশের জন্য অসামান্য অবদান রেখেছেন খালেদা জিয়া। তাঁকে আমার ভালো করে জানার সুযোগ হয়েছে। আমার দায়িত্ব পালনকালে বিরোধীদলে ছিলেন খালেদা জিয়া। সবাই খালেদা জিয়ার সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে পারতো। তিনি সবার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি সহজ করে রেখেছিলেন। আমি তাঁর সঙ্গে যখনি দেখা করতে গিয়েছি তিনি সময় দিয়েছেন।

রাষ্ট্রদূত মোজেনা বলেন, “অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে তিনি সংগ্রাম করে গেছেন। অন্যরা যখন কষ্টে হাল ছড়ে দিয়েছে তিনি কখনো তা করেনি। কখনো প্রশ্ন করেননি- কেনো আমাকে এধরনের নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে? তিনি ছিলেন উন্মুক্ত এবং উদার হৃদয়ের মানুষ। তিনি ছিলেন খুবই আন্তরিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষ। রাষ্ট্রদূত হিসাবে আমার কিছু সীমাবদ্ধতা এবং নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সেগুলো বিবেচনায় রেখেই আমি খালেদা জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। তিনি একজন মহৎ মানুষ। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের উন্নতি ঘটেছে”তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ যে সম্মানের সাথে খালেদা জিয়াকে চিরবিদায় জানিয়েছেন, তাতে তিনি অভিভূত।

আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেন, ‘বহু নির্যাতন সহ্য করেও বেগম খালেদা জিয়া কখনো অভিযোগ করেননি। সকালের নাস্তা কিংবা রমজানের ইফতার—সব আয়োজনে তাঁর অতিথিপরায়ণতা ও হৃদ্যতা মুগ্ধ করত সবাইকে।”রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার অনেকবার দেখা হয়েছে। খুব বিপদ এবং সংকটের মধ্যেও তিনি ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল এবং আন্তরিক। খালেদা জিয়া ছিলেন খুবই অমায়িক প্রকৃতির মানুষ। তিনি বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করেছেন। একজন নারী হিসাবে বাংলাদেশকে খালেদা জিয়া যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন তা এশিয়া উপমহাদেশে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন তার লিগ্যাসি স্মরণে রাখবে মানুষ।

ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি মার্ক শেফ বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক চ্যাম্পিয়নের স্মরণসভা আয়োজন করতে পেরে তারা গর্বিত। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলেও স্বীকৃত।

সাংবাদিক ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি রাজনীতির হাল ধরতে বাধ্য হন। সমর্থকদের চাপে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ সময় রাজনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করেন।

এহতেশামুল হক বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দুই সন্তানসহ আটক হওয়া, স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত, পরবর্তী সময়ে সন্তানদের নিয়ে সীমাহীন অনিশ্চয়তা—সবকিছু ছাপিয়ে তিনি গণতন্ত্রের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্যেও তাঁকে দমিয়ে রাখা যায়নি।

ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তজা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়া পরিবার সবচেয়ে জনপ্রিয় অবস্থানে পৌঁছেছে। গণতন্ত্র ও জাতীয় রাজনীতিতে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অবদান অনস্বীকার্য।

ম‍্যারন বিলকাইন্ড বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়—গণতন্ত্র কোনো উপহার নয়, এটি রক্ষার জন্য প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত থাকতে হয়। যারা ক্ষমতায় থাকেন তারাই ইতিহাস গড়েন না, বরং যাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধৈর্য ও সাহস নিয়ে লড়াই করেন, তাঁরাই ইতিহাসের নায়ক হয়ে থাকেন।

আলোচনার আগে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়, যা উপস্থিত অতিথিদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।

ওয়াশিংটনের এই স্মরণসভা ছিল গণতন্ত্রের এই মহান নেত্রীর প্রতি আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা প্রমাণ করে গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার নাম বিশ্বমঞ্চে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও শ্রদ্ধার।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের সম্পদ বিবরণী অনুসন্ধানে দুদকের কর্মকর্তা নিয়োগ

প্যারিসে গ্যাস বিস্ফোরণে দুই বছরের বাংলাদেশি শিশুর মৃত্যু, আহত ৭

পুতিন, ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের ইঙ্গিত দিলো মস্কো

সংসদ থেকে বিরোধী দলের ওয়াকআউট

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৬১ বাণিজ্য বাধার মধ্যে ৪৮টির সমাধান

১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের গাড়িবহরকে লাল কার্ড, ছাত্রদল নেতার দাবি—জনভোগান্তির প্রতিবাদ

মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানিতে বড় ধস, কমেছে ৩৯ শতাংশ

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এলাকা ছেড়ে পালালো মার্কিন দুই যুদ্ধজাহাজ

কবর থেকে পীর শামীমের দেহাবশেষ তুলে দরবারে নিয়ে গেল ভক্তরা

রাজধানীতে ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৪৩৪

১০

৫০০ বছরের পুরোনো মানচিত্র বদল, বিশ্বকে নতুনভাবে দেখাবে জাতিসংঘ

১১

রাজধানীতে কালো ধোঁয়ার গাড়ি দেখলেই ব্যবস্থা

১২

ডাক বিভাগের রেকর্ড: ২ মাসে পণ্য পরিবহন ৪০০ টন

১৩

তারেক রহমানের সফর নিয়ে জানানোর মতো তথ্য নেই: নয়াদিল্লি

১৪

দেশের অস্ত্র ঘাটতির সংবাদ প্রকাশকারীরা ‘দেশদ্রোহী’: ট্রাম্প

১৫

বাংলাদেশসহ ৩১ দেশের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা বাতিল করল মালয়েশিয়া

১৬

দীর্ঘায়িত হচ্ছে ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ, প্রস্তুতি চলছে ২০২৭ সালের

১৭

হরমুজ প্রণালিতে সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া

১৮

সেফটি ভালভের ত্রুটিতে রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন ফের অনিশ্চয়তায়

১৯

যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানায় না

২০