ইহুদি জাতির বিতর্কিত প্রতিশ্রুত ভূমির রূপরেখা - সমকন্ঠ
রবিবার , ৩১ মে ২০২৬
সমকন্ঠ
১৯ অগাস্ট ২০২৫, ৮:৪২ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ইহুদি জাতির বিতর্কিত প্রতিশ্রুত ভূমির রূপরেখা

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি গ্রেটার ইসরায়েল (বৃহত্তর ইসরায়েল) ধারণার সঙ্গে অত্যন্ত একমত। তিনি ডানপন্থী সাবেক এমপি শ্যারন গলের কাছ থেকে প্রতিশ্রুত ভূমির প্রতীকী কবজ গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই মন্তব্য আরব ও মুসলিম বিশ্বে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আরব দেশগুলো তাঁর এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।

তারা গ্রেটার ইসরায়েলের ধারণাকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি মনে করে।

গ্রেটার ইসরায়েল’ মূলত একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ধারণা। যে ধারণার মূলকথা হলো, ইসরায়েল রাষ্ট্রের সীমানা মিসরের নীল নদ থেকে ইরাকের ফোরাত নদীর মধ্যবর্তী ভূমিতে বিস্তৃত করা। কেননা এই ভূমির ওপর ইহুদি জাতির ঐশ্বরিক অধিকার রয়েছে।

অনেকেই এটাকে ইসরায়েলের অতি ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের উচ্চ আকাঙ্ক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেন। আবার কারো কারো দাবি, ইসরায়েল রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ নীতি প্রমাণ করে ইসরায়েল রাষ্ট্র গ্রেটার ইসরায়েল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে।

গ্রেটার ইসরায়েল ধারণার মূলভিত্তি হলো হিব্রু বাইবেলের একটি উদ্ধৃতি। যাতে বলা হয়েছে, সেদিন সদাপ্রভু ইবরাহিমের সঙ্গে এক চুক্তি করলেন এবং বললেন, আমি তোমার বংশধরদের এই দেশ দিলাম, মিসরের নদী (নীল নদ) থেকে শুরু করে সেই মহা ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদী পর্যন্ত।

হিব্রু বাইবেল ও ওল্ড টেস্টামেন্টের ব্যাখ্যা অনুসারে আল্লাহর এই প্রতিশ্রুতি কেবল ইবরাহিম (আ.)-এর পুত্র ইসহাক (আ.) এবং তাঁর ছেলে ইয়াকুব (আ.)-এর সন্তানদের জন্য প্রযোজ্য। ইসমাঈল (আ.)-এর সন্তানদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তাই প্রতিশ্রুত ভূমির ওপর কেবল বনি ইসরাঈল বা ইহুদি জাতিরই ঐশ্বরিক অধিকার রয়েছে।

ইহুদি ঐতিহাসিকরা দাবি করেন, নীল নদ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত যে বিস্তৃত ভূমির প্রতিশ্রুতি আল্লাহ বনি ইসরাঈলকে দিয়েছিলেন তার ওপর ইহুদি শাসক দাউদ (আ.) ও সুলাইমান (আ.)-এর শাসনাধীন ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্যাবিলনের শাসক নেবুচাদনেজার খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে এবং আসিরীয় সম্রাট দ্বিতীয় সারগন খ্রিস্টপূর্ব ৭২২ অব্দে অন্যায়ভাবে ইহুদিদের উচ্ছেদ করে এবং তাদের ওপর দাসত্ব চাপিয়ে দেয়।

আধুনিক ইহুদিবাদের জনক থিওডর হার্জেল গ্রেটার ইসরায়েল ধারণার উপস্থাপক। তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, ইহুদি রাষ্ট্র মিসরের নদী থেকে ফোরাত পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া উচিত। ইসরায়েলের রাজনীতিতে থিওডর হার্জেলের রাজনৈতিক দর্শন অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাই উগ্র ডানপন্থী ইহুদিরা বিশ্বাস করে গ্রেটার ইসরায়েলের বাস্তবায়ন ছাড়া ইহুদি রাষ্ট্র পূর্ণতা পাবে না। তারা গ্রেটার ইসরায়েলের বাস্তবায়নকে শুধু রাজনৈতিক বিষয় মনে করে না, তারা মনে করে এটা প্রভুর নির্দেশের বাস্তবায়ন এবং তাদের ন্যায্য অধিকার আছে এমন ভূমির পুনরুদ্ধার।

 

গ্রেটার ইসরায়েল বাস্তবায়ন হলে ভূমি হারাবে যারা

গ্রেটার ইসরায়েলের বহুল প্রচলিত মানচিত্র অনুসারে লেবানন ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র তার অস্তিত্ব হারাবে, জর্দানের প্রায় পুরো ভূমি হারিয়ে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হবে। সিরিয়ার প্রায় অর্ধেক, সৌদি আরব হিজাজ ও তাবুক অঞ্চলসহ মরু অঞ্চলের বড় একটি অংশ, ইরাক আনবার প্রদেশ ও ফোরাত নদীর পশ্চিমাঞ্চলসহ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং মিসর সিনাই ছাড়াও কায়রোসহ মিসরের পূর্বাঞ্চল হারাবে। এতে উল্লিখিত দেশগুলো শুধু স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বই হারাবে না, বরং তাদের রাষ্ট্র ও জাতিসত্তা চরমভাবে হুমকির মুখে পড়বে। এসব দেশের লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে যাবে। সর্বোপরি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।

গ্রেটার ইসরায়েল কি বাস্তবায়ন হবে

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গ্রেটার ইসরায়েলের বাস্তবায়ন অনিশ্চিত। কেননা তা বেশ কয়েকটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের মানচিত্রে পরিবর্তন আনা ছাড়া সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক আইনও তা সমর্থন করে না। তবে বহু ইসরায়েলি এই মানচিত্র বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখে। এ ছাড়া ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসরায়েল তার সীমানা বিস্তৃত করার চেষ্টা করে আসছে। এই চেষ্টার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ। যখন ইসরায়েল ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীর, সিরিয়ার গোলান হাইটস, জর্দানের আল বাকুরা ও আল ঘামর এবং মিসরের সিনাই উপদ্বীপ দখল করে, পরবর্তী সময়ে মিসর ও জর্দান ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে নিজ নিজ ভূমি ফেরত পায়। ইসরায়েল গোলান উচ্চ ভূমিকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণা দেয়। আন্তর্জাতিকভাবে গোলান হাইটস সিরিয়ার অংশ হলেও আমেরিকা এই ভূমির ওপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে। পশ্চিমে অবৈধ বসতি স্থাপন এবং সম্পূর্ণ গাজার ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ।

ছয় দিনের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইসরায়েলে ‘মুভমেন্ট ফর গ্রেটার ইসরায়েল’ নামের একটি রাজনৈতিক দলও গঠিত হয়েছিল, যা ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। তারা দখলকৃত ভূমি ধরে রাখা, তাতে ইহুদি বসতি স্থাপন করা, প্রতিশ্রুত ভূমি উদ্ধারে তৎপরতা বৃদ্ধি এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা ছিল এই দলের প্রধান লক্ষ্য। তবে বর্তমানে এই দলের অস্তিত্ব নেই। ১৯৭৬ সালে দলটি বিলুপ্ত করা হয়।

২০২২ সালে ইসরায়েলের বর্তমান ডানপন্থী সরকার ক্ষমতায় আসার পর গ্রেটার ইসরায়েলের আলোচনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসরায়েলের অনেক মন্ত্রী প্রকাশ্যে এই ধারণার পক্ষে কথা বলেন। তাঁরা ইসরায়েল রাষ্ট্রের সীমানা বিস্তার, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ এবং অবৈধ বসতি স্থাপনের প্রতি জোরাল সমর্থন ব্যক্ত করে থাকেন, যা আরব দেশগুলোর ভেতর দারুন উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও সীমানা বিষয়ে কোরআন-হাদিসে স্পষ্ট কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের আগে শাম অঞ্চল তথা সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিনে সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে। দাজ্জাল মক্কা ও মদিনার উপকণ্ঠে পৌঁছে যাবে। ৭০ ইহুদি দাজ্জালের সঙ্গী হবে। (বিস্তারিত দেখুন : দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ কোথায় হবে, কালের কণ্ঠ, ৭ মার্চ ২০২৪)

মিডল ইস্ট আই, ইসলাম২১সিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম অবলম্বনে

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জিয়াউর রহমানের সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

ট্রেনে নারীদের জন্য আলাদা কোচ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে- রেলমন্ত্রী

আফ্রিকার দেশে স্বর্ণের খনি ধসে নিহত ২৮

কুষ্টিয়ায় মাদক ও ওষুধসহ কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য জব্দ

বিশ্বে ১২০ কোটি মানুষ ভুগছে মানসিক সমস্যায়

‘গোপন অস্ত্র উন্মোচন’ কিয়েভে ধ্বংসযজ্ঞ চালাল রাশিয়া

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের চেয়ারম্যানের পদত্যাগ

স্ত্রীসহ সোহেলের বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ, শুনানি ১ জুন

অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে আধুনিক আইন প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

রাষ্ট্রীয় খরচে আসামিপক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দিল সরকার

১০

বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের আটকে রাখতে পশ্চিমবঙ্গে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরির নির্দেশ

১১

রাতের মধ্যে ৬ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত

১২

ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের সময় বজ্রপাতে প্রাণ গেল যাত্রীর

১৩

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভালো খবর আসছে- ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কো রুবিওর আভাস

১৪

ঈদে ৬ দিন মহাসড়কে ট্রাক-লরি চলাচল বন্ধের ঘোষণা ডিএমপির

১৫

মোদি-রুবিওর বৈঠক- হোয়াইট হাউস সফরের আমন্ত্রণ

১৬

পাটওয়ারীর ওপর হামলা, ঘণ্টাব্যাপী প্রতীকী অবস্থান

১৭

ঐক্যের ডাক মির্জা ফখরুলের

১৮

পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে কড়া বার্তা ইরানের স্পিকার বাঘের ঘালিবাফের

১৯

পশ্চিমবঙ্গে কোরবানি ঈদের ছুটি কমিয়ে ১ দিন করল শুভেন্দুর সরকার

২০