১৯৭১ সালের ২০ মে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরের ভদ্রা নদীর তীরে সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা শান্তিলতা মল্লিক আর নেই। দীর্ঘ জীবনসংগ্রাম শেষে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল ৭টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
চুকনগর গণহত্যার ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেও মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফেরা এই নারী পরবর্তীতে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতার পরও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ, নিরহংকার ও নিভৃতচারী। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ১৯৭১-এর সেই ভয়াল স্মৃতি বয়ে নিয়ে পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
১৯৭১ সালের ২০ মে চুকনগরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হন। প্রাণ বাঁচাতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে চুকনগরে জড়ো হওয়া মানুষগুলোর ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, কান্না আর রক্তের স্রোত।
সেই ভয়াবহতার মধ্যে শান্তিলতা মল্লিকও ছিলেন। মৃত্যুর স্তূপ, রক্তাক্ত মানুষ আর চারপাশের বিভীষিকার মধ্য দিয়ে তিনি অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান। পরবর্তীতে দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার ৩ নম্বর গঙ্গারামপুর ইউনিয়নের বয়ারভাঙ্গা গ্রামে ছিল তাঁর স্থায়ী নিবাস। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করলেও তিনি পরবর্তী জীবনে সেই স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে নয়, বরং পরিবার ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন।
তাঁর সন্তানদের মধ্যে সুদীপ্ত সরকার রনি উল্লেখযোগ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের (DUFS) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীতে ৩০তম বিসিএস পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে কর্মজীবনে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শান্তিলতা মল্লিকের শেষ বিদায়ও হয়ে ওঠে ব্যতিক্রমী ও আবেগঘন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। সরকারের পক্ষে গার্ড অব অনার প্রদানের নেতৃত্ব দেন বটিয়াঘাটা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. শোয়েব শাত-ঈল-ইভান। তাঁর নির্দেশনায় বটিয়াঘাটা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল সশস্ত্র সালাম প্রদান করে।
তবে গার্ড অব অনারের সেই মুহূর্তে উপস্থিত সবার নজর ছিল একটি বিশেষ দৃশ্যের দিকে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের মাকেই গার্ড অব অনার দিতে অংশ নেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদীপ্ত সরকার।
একদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর দায়িত্ব, অন্যদিকে জন্মদাত্রীকে হারানোর ব্যক্তিগত শোক—দুই অনুভূতির ভার একসঙ্গে বহন করতে দেখা যায় তাঁকে। দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর পেশাদারিত্বের পাশাপাশি চোখের জলও উপস্থিত স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।
গার্ড অব অনার শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শোয়েব শাত-ঈল-ইভান বলেন, “আজ এই গার্ড অব অনারে এক বিরল অভিজ্ঞতা হলো। একজন সন্তান তাঁর মায়ের রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেন। তিনি যখন তাঁর মাকে সম্মাননা প্রদান করছিলেন, তখন একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং একজন সন্তান হিসেবে নিজের ভেতরের প্রবল আবেগ ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন। এটাই আমাদের জীবন, এটা নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “মা হিসেবে তিনি হয়তো উপর থেকে দেখছেন তাঁর সন্তানের এই বিশেষ শ্রদ্ধা নিবেদন। আমি মনে করি, তিনি একজন অত্যন্ত গর্বিত সন্তান, কারণ তিনি নিজ হাতে তাঁর মাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে সম্মানিত করতে পেরেছেন।”
চুকনগর গণহত্যার ভয়াবহতার জীবন্ত সাক্ষী শান্তিলতা মল্লিকের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; মুক্তিযুদ্ধের এক প্রত্যক্ষ ইতিহাসের সাক্ষীর বিদায়ও। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাঁর শারীরিক উপস্থিতির অবসান হলেও ১৯৭১-এর সেই ভয়াল দিনের স্মৃতি এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন