দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আগামী ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন। আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয়েছে সরব প্রচার-প্রচারণা। পোস্টার, লিফলেটে শিক্ষার্থীদের সমর্থন আদায়ে ব্যস্ত প্রার্থীরা দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।
প্রার্থীদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি, প্যানেল গঠন এবং নির্বাচন ঘিরে সার্বিক পরিস্থিতি জানতে চার ভিপি পদপ্রার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন যুগান্তরের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি। তারা হলেন- শেখ সাদী হাসান (জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল), আব্দুর রশিদ জিতু (স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন), আরিফ উল্লাহ (ইসলামী ছাত্রশিবির), আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল (বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ)।
জাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) শেখ সাদী বলেন, আমাদের দলে একটি পদের জন্য একাধিক যোগ্য প্রার্থী ছিল। ফলে আমরা সময় নিয়ে অভ্যন্তরীণ ভোটাভুটির মাধ্যমে সৎ, যোগ্য, মেধাবী ও অধিকার আদায়ে যারা সব সময় সোচ্চার ছিল এবং সম্মুখভাগে নেতৃত্ব দিয়েছে এমন শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমাদের প্যানেল গঠন করা হয়েছে।
নির্বাচিত হলে শিক্ষার্থীদের জন্য কী কী কাজ করবেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রথমেই আমি তিনটি কাজ করব- প্রথমত, শিক্ষার্থীদের মৌলিক সমস্যা (খাবারের মান, স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াতসহ এ ধরনের সব সমস্যা) সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহণ করব। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও গবেষণায় কাঠামোগত মান উন্নয়ন। তৃতীয়ত, অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করা। এছাড়াও জাকসুর ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য জাকসু সেল ও শিক্ষার্থীদের যে কোনো সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য আলাদা শিক্ষার্থী সেল গঠন করব। এমনকি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার শেষের দিকে ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করব, যাতে তারা হতাশাগ্রস্ত না হয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীদের সাড়া পাওয়ার বিষয়ে নিয়ে তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হিসেবে যখন শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছি তখন তাদের কাছ থেকে আমরা অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছি। বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে আমাদের সরব উপস্থিতি থাকায় শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই আমাদের জানে এমনকি আমাদের ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রায় ৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে ফ্রি ‘হেপাটাইটিস বি’ ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রামের আওতায় এনেছি; যা সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের করা উচিত ছিল তা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল করেছে। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশের জন্য মেয়েদের নাইট টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছি, দুর্ঘটনা এড়াতে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে গতিসীমা বিলবোর্ড লাগিয়েছি, প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার্থে গাছে গাছে পাখিদের আবাসস্থল স্থাপন করেছি। এমনকি বিভিন্ন অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থেকেছি। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীরা আমাদের ভোট দিবে বলে আশা করি।
নির্বাচিত হলে শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন’ প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতু।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পরামর্শেই আমি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি। কারণ ভিপির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচন করতে হলে সবার সমর্থন বা সহযোগিতা দরকার। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও প্যানেল ঘোষণা করেছে। রাজনৈতিক দলের বাইরে গিয়ে আমরা এই প্যানেল ঘোষণা করছি। যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে আমরা আমাদের প্যানেল ঠিক করেছি। অর্থাৎ যিনি যে কাজে পারদর্শী বা অভিজ্ঞ, তাকে সেই পদে দিয়েছি। আমাদের প্যানেল ইনক্লুসিভ, যেখানে সবার মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা আমাদের সঙ্গে আছেন বলেই আমরা সাহস পাই। সাধারণ শিক্ষার্থীরাই আমাদের দল, আমরা তাদের দলের কর্মী- এই আত্মবিশ্বাস থেকে আমরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছি।
নির্বাচিত হলে কী করবেন? জানতে চাইলে জিতু বলেন, নির্বাচনের আগে অনেকেই অনেক ইশতেহার দেয়। কিন্তু আগে জানতে হবে যে জাকসু কাঠামোর মধ্যে আমার কী কী কাজ করার এখতিয়ার আছে। সেই অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ দিয়ে কাজ করব। আমি বলব না যে নির্বাচিত হলে ক্যাম্পাস গেটে মেট্রোরেল নিয়ে আসব। আমি শিক্ষার্থীদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করব, যাতে বছরের পর বছর ধরে তারা উপকৃত হন। শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করব আমি। আমার একটাই কথা-জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সবার আগে।
এছাড়াও তিনি বলেন, আমি আশা করব, যারাই নির্বাচিত হবেন, হয়তো বিভিন্ন প্যানেল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের থেকে বিভিন্ন পদে নির্বাচিত হয়ে তারা আসবেন, কিন্তু দল-মত নির্বিশেষে তারা এক হয়ে কাজ করবেন। সবাই শিক্ষার্থীদের স্বার্থ দেখবেন। শিক্ষার্থীবান্ধব একটি ক্যাম্পাস গড়ে তুলবেন।
সমন্বিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল থেকে মনোনীত ভিপি পদপ্রার্থী ছাত্রশিবিরের আরিফ উল্লাহ। জাকসু নিয়ে আলাপে তিনি বলেন, জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী সব ছাত্রসমাজকে নিয়ে গড়তে চাই। আমরা এই লক্ষ্যে ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল গঠনে জুলাই আহত যোদ্ধা, ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জড, নারী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃত্বদানকারী সদস্যদের যারা দক্ষ, জবাবদিহিতায় স্বচ্ছ, নারীর নিরাপত্তায় অঙ্গীকারবদ্ধ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ়প্রত্যয়ী তাদের প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
নারী শিক্ষার্থীদের বিষয়ে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা অধিকারের ক্ষেত্রে পুরুষ থেকে নারীদেরই অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এই ক্যাম্পাসে প্রায় ৫০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী, তাই প্রধান অঙ্গীকার থাকবে নারীদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করার। প্রথমে মেয়েদের হল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করার ব্যবস্থা গ্রহণ করব, যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল’ এর কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি একটি ‘জরুরি রেসপন্স’ কমিটি গঠন ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। পাশাপাশি ছাত্রী হলগুলোতে নিরাপদ খাদ্য, প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, ক্রীড়া ও শরীরচর্চার সুবিধা, সমৃদ্ধ রিডিং ও কমনরুম, নামাজের জন্য সুব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা আমাদের অঙ্গীকার।
তিনি আরও বলেন, সেশনজট রয়েছে তা নিরসনে একাডেমিক ক্যালেন্ডার বাস্তবায়নের চেষ্টা থাকবে। প্রশাসনিক ও একাডেমিক সব কাজ সম্পূর্ণ অটোমেশন প্রক্রিয়ার আওতায় আনা, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকট নিরসন, ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গঠনে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলো সংস্কার ও ফুটপাত সংযোজন, ক্যাম্পাসের ভিতরে ও আবাসিক হলে নিরাপদ খাদ্য ও খাবার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি টিম গঠন করা। এছাড়া প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার্থে ইকোলজিক্যাল মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল সেন্টার স্থাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ। সর্বোপরি আমাদের লক্ষ্য জাহাঙ্গীরনগর একটি প্রাণবন্ত, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা, যেখানে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রকৃতি সমানভাবে বিকশিত হবে।
আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ সমর্থিত ‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’ থেকে ভিপি পদে নির্বাচন করছেন। উজ্জ্বল বলেন, আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়নি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরের সচেতন শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’ নামে একটি ইনক্লুসিভ প্যানেল গঠন করেছি। এখানে এমন শিক্ষার্থীদেরই রাখা হয়েছে যারা দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করে আসছেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ভিপি নির্বাচিত হলে কী করবেন? এর জবাবে তিনি বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে ‘শিক্ষার্থীদের অধিকার, আমার অঙ্গীকার’। এছাড়া শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, গবেষণা সহায়তা ও শিক্ষাবৃত্তি বৃদ্ধি, একাডেমিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীবান্ধব রাজনীতি ও জাকসুর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে চাই।
নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে বলেন, নির্বাচনি পরিবেশ এখনও স্বাভাবিক রয়েছে। যেহেতু কোনো দলীয় সরকার ক্ষমতায় নেই, সেই জায়গা থেকে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার মতো কোনো পরিস্থিতি এখনও আমরা দেখছি না।
তিনি আরও বলেন, আমরা আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর পর থেকেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছি। কেননা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই আমরা সব সময় শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে তাদের পাশে থেকেছি, আন্দোলন করেছি। এছাড়া আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলে আকাঙ্ক্ষার কথাগুলো শুনছি, আমাদের অঙ্গীকারগুলো উপস্থাপন করছি। এতে তারা আমাদের আরও উৎসাহ প্রদান করছে।
মন্তব্য করুন