খুলনা-যশোর সীমান্তে কেশবপুর উপজেলার গৌরীঘোনা ইউনিয়নের ভদ্রা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত ভরতভায়না গ্রাম। সেখানেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১৮০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এক প্রত্ননিদর্শন যা স্থানীয়দের কাছে ‘ভরতের দেউল’ বা ‘ভরত রাজার দেউল’ নামে পরিচিত।
অনেকটা পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের নকশার মতো দেখতে এই প্রাচীন স্থাপনাটি প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, খ্রিষ্টীয় তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত একটি মন্দির। ব্যবহৃত ইট, পোড়ামাটির মূর্তি ও স্থাপত্যশৈলী বিশ্লেষণ করে তারা একে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন বলে মনে করেন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন জানান, প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা, এটি আদি ঐতিহাসিক যুগের স্থাপনা। দেশে এই যুগের স্থাপনা খুবই বিরল। ভরতভায়না মন্দির দক্ষিণবঙ্গের একমাত্র আদি ঐতিহাসিক যুগের নিদর্শন।
স্থাপত্যের পরিভাষা অনুযায়ী এ ধরনের মন্দিরকে ‘সর্বতোভদ্র শৈলী’ বলা হয়। সোমপুর মহাবিহার, শালবন বিহার ও বিক্রমশীলা মহাবিহারের কেন্দ্রীয় মন্দিরের নকশাও এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
১৯২২ সালে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ এই ঢিবিটিকে সংরক্ষণ করে। পরের বছর ১৯২৩ সালে কাশীনাথ দীক্ষিত জরিপ পরিচালনা করে মন্তব্য করেন, ঢিবির নিচে রয়েছে অন্তত পাঁচ শতকের পুরোনো এক বৌদ্ধমন্দির। তার ধারণা, এটি হয়তো হিউয়েন সাং বর্ণিত ‘সমতটের ৩০টি সংঘারামের’ একটি।
তবে সময়ের সাথে সুযোগসন্ধানী মানুষজন বহু মূল্যবান প্রত্নসম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। প্রচলিত মতে, ভরত নামধারী এক প্রভাবশালী রাজা মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। স্থাপনাটি অবস্থিত প্রায় ১ একর ২৯ শতক জমির ওপর।
বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৮৫ সালে প্রথম এখানে খনন শুরু করে। পরে ১৯৯৫-৯৬ ও ২০০০-০১ সালে পুনরায় খননকাজ চালানো হয়। এতে একটি বিশাল স্থাপনার ভিত্তি অংশ উন্মোচিত হয়, যা থেকে ধারণা করা হয় যে, মূল অট্টালিকা ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও তার মঞ্চভাগ এখনো অক্ষত রয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নকশা অনুযায়ী, দেউলটিতে মোট ৮২টি বদ্ধ প্রকোষ্ঠ রয়েছে, যা ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠেছে শীর্ষ ধাপের দেয়াল ৯ ফুট প্রশস্ত, এতে চারটি বর্গাকার প্রকোষ্ঠ; দ্বিতীয় ধাপে ৩ ফুট চওড়া দেয়ালের মধ্যে ১৯টি প্রকোষ্ঠ; তৃতীয় ধাপে ১৮টি, চতুর্থ ধাপে ১৯টি প্রকোষ্ঠ; সর্বনিম্ন ধাপে ২২টি প্রকোষ্ঠ এবং প্রায় ১০ ফুট চওড়া প্রদক্ষিণপথ রয়েছে।
মন্দিরের চার পাশে প্রবেশপথ ছিল। পূর্বদিকের প্রবেশপথটিই মূল প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। ব্যবহৃত ইটের মাপ ছিল ৩৬×২৬×৬ সেন্টিমিটার, যা এ অঞ্চলের অন্য কোনো প্রাচীন স্থাপনায় দেখা যায় না।
খননের সময় পাওয়া গেছে গুপ্তযুগের পোড়ামাটির মাথা, মানুষের হাত-পায়ের ভগ্নাংশ, মাটির প্রদীপ, অলংকৃত ইট ও পদচিহ্নসংবলিত টুকরো। এসব নিদর্শন এখন খুলনা বিভাগীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এছাড়া ভরত রাজার দেউলে একটি ছোট জাদুঘরও রয়েছে।
সহজ যোগাযোগ ও পর্যটন সম্ভাবনা
যশোরের কেশবপুর থেকে চুকনগর বাজার হয়ে গৌরীঘোনা সড়ক ধরে কিছু দূর গেলেই ভরতভায়না গ্রাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই এলাকায় বিশাল এক বটগাছ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে দেউলের অবশিষ্ট কাঠামো। কেশবপুর সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে।
মন্তব্য করুন