ইরানে চলমান নজিরবিহীন সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সংহতি জানিয়ে বিবৃতি দেওয়ায় যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতদের জরুরি তলব করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) তেহরানে নিযুক্ত এই চার দেশের কূটনীতিকদের ডেকে এনে ইরান সরকার তাদের কড়া প্রতিবাদ জানায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, তলব করা রাষ্ট্রদূতদের সামনে বিক্ষোভের কিছু নির্দিষ্ট ভিডিও চিত্র উপস্থাপন করেছেন ইরানি কর্মকর্তারা।
ওই ফুটেজগুলো দেখিয়ে তেহরান দাবি করেছে যে, চলমান আন্দোলন শান্তিপূর্ণ সীমানা ছাড়িয়ে সুসংগঠিত ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে রূপ নিয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ এসব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থনসূচক সরকারি বিবৃতিগুলো অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
ইরান সরকার এই বিক্ষোভকে শুরু থেকেই বিদেশি উসকানি ও ষড়যন্ত্র বলে দাবি করে আসছে। তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই আন্দোলনকে আরও সহিংস করতে দাঙ্গাকারীদের সরাসরি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছে।
বিশেষ করে বিক্ষোভ দমনে বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) থেকে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখায় পশ্চিমা বিশ্ব যে সমালোচনা করেছে, তাকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে ইরান। যদিও পশ্চিমা দেশগুলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়ে বিক্ষোভকারীদের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়ে আসছে, কিন্তু ইরান সরকার একে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০২২ সালের পর বর্তমান এই আন্দোলনকে দেশটির ধর্মতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন রাজনৈতিক রূপ নিয়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটের ভয়াবহতা এতটাই যে, ডলারের বিপরীতে রিয়ালের রেকর্ড অবমূল্যায়ন ঘটে বিনিময় হার ১ ডলারে ১ লাখ ৪৫ হাজার রিয়ালে পৌঁছেছে।
বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের এই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে বিদেশি শক্তিগুলো ফায়দা লুটছে বলে দাবি ইরানের। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অর্থনৈতিক দুর্দশার হাত থেকে বাঁচতেই সাধারণ মানুষ রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছে।
ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে হতাহতের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ না করলেও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অধিকার সংগঠন ‘এইচআরএএনএ’ জানিয়েছে, অভিযানে এ পর্যন্ত অন্তত ৫৪৪ জন নিহত এবং সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এ ছাড়া আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১০ হাজার ৬৮১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বর্তমান পরিস্থিতির সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় চার দেশের রাষ্ট্রদূতদের তলব করার ঘটনাটি পশ্চিমাদের সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ককে এক চূড়ান্ত সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
মন্তব্য করুন