রাজশাহীতে বিচারকের ছেলে হত্যার স্বীকারোক্তি ঘাতক লিমন মিয়ার - সমকন্ঠ
বৃহস্পতিবার , ১ অক্টোবর ২০২৬
সমকন্ঠ
১৪ নভেম্বর ২০২৫, ১১:১৭ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

রাজশাহীতে বিচারকের ছেলে হত্যার স্বীকারোক্তি ঘাতক লিমন মিয়ার

রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আব্দুর রহমানের ছেলে তাওসিফ রহমান সুমনকে (১৬) কুপিয়ে হত্যার লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি দিয়েছে ঘাতক লিমন মিয়া। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন লিমন মিয়া বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশের সামনে সাংবাদিকদের কাছে এই স্বীকারোক্তি দেয়।

এদিকে আটক লিমন মিয়ার (৩৫) বিরুদ্ধে সাতদিন আগেই একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন হামলায় আহত বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসী (৪৪)। পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে সিলেটের জালালাবাদ থানায় জিডিটি করেছিলেন তিনি। তবে ওই জিডির তদন্ত এখনো শুরুই হয়নি।

বৃহস্পতিবার রাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পুলিশের উপস্থিতিতে ঘাতক লিমন মিয়া সাংবাদিকদের সামনে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে।

এসময় ঘাতক লিমন মিয়াকে বলতে শোনা যায়, ‘বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসীর সাথে তার ৫ বছরের পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কের জেরে প্রেমিকা লুসী তাকে পুলিশে দিয়েছে, জেলও খাটিয়েছে এবং নানাভাবে হয়রানিও করেছে। লুসীর প্রেমে তিনি অন্ধ। কিন্তু ফোন করলেও লুসী তার ফোন ধরে না। লুসী ফোন না ধরলে সে পাগল প্রায় হয়ে যায়। এ কারণে লুসীর সাথে দেখা করতেই সে রাজশাহীর বাসায় আসে। এসেই লুসীর হাতে বাদাম ও পপকর্ণ তুলে দেয়। প্রাথমিক কথাবার্তার পর ঘাতক লিমন মিয়া, বিচারকের স্ত্রী লুসীকে নিয়ে টি-বাধে যাওয়ার জন্য চাপাচাপি করে। এক পর্যায়ে লুসীর ছেলে এসে তাকে আঘাত করে। এসময় সেও লুসীর ছেলেকে আঘাত করে। এর পর কি হয়েছে, তা আর বলতে পারবে না বলে দাবি করেছে ঘাতক লিমন মিয়া। এই ঘটনার জন্য ঘাতক লিমন মিয়া সরকার ও দেশবাসীর কাছে বিচার দাবিও করেছে।

জানা গেছে, গত ৬ নভেম্বর করা জিডিতে বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসী উল্লেখ করেছেন, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সদস্য হওয়ায় লিমনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। পরিচয় হওয়ার পর সে আমার মোবাইল নম্বর নেয়। তার পরিবার আর্থিকভাবে কিছুটা দুর্বল হওয়ায় প্রায় সময় সে আমার কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিত। একটা পর্যায়ে লিমন প্রতিনিয়ত আমার কাছে সহযোগিতা চাইলে আমি তা করতে অপারগতা প্রকাশ করায় সে ফোন করে নানারকম হুমকি-ধমকি দিচ্ছে।

জিডিতে বলা হয়, সর্বশেষ গত ৩ নভেম্বর সকালে লিমন আমার মেয়ের ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে কল করে আমাকে ও আমার পরিবারের লোকজনদের প্রাণে হত্যা করবে বলে হুমকি দেয়। লিমন যে কোন সময় আমিসহ আমার পরিবারের সদস্যদের বড় ধরনের ক্ষতিসাধন করিতে পারে বলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিতেছি। এ অবস্থায় ব্যক্তি নিরাপত্তার স্বার্থে জিডি করা একান্ত প্রয়োজন।

যোগাযোগ করা হলে জালালাবাদ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহ মোহাম্মদ মোবাশ্বির বলেন, জিডি হওয়ার পর আদালত থেকে তদন্তের অনুমতি নিতে হয়। আমরা জিডিটি আদালতে পাঠিয়েছি। তবে এখনও তদন্তের অনুমতি পাইনি। তাই জিডির তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।

ওসি আরও জানান, বিচারক আব্দুর রহমানের মেয়ে বিবাহিত। তবে তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তাই সিলেটে মেয়ের কাছে ছিলেন তাসমিন নাহার লুসী। সেখানে থাকা অবস্থায় লিমন মিয়ার হুমকি পেয়ে তিনি থানায় জিডি করেছিলেন।
বিচারক আব্দুর রহমানের গ্রামের বাড়ি জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলার চকপাড়া গ্রামে। ঘাতক লিমন মিয়ার বাড়ি গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার মদনেরপাড়া ভবানীগঞ্জ গ্রামে। তার সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশ বলছে, লিমন এই পরিবারের পূর্বপরিচিত। বিচারকের নিহত ছেলে সুমন রাজশাহী গভ: ল্যাবরেটরি স্কুলে নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল।
বিচারক আব্দুর রহমান রাজশাহী মহানগরীর তেরোখাদিয়া ডাবতলা এলাকার স্পার্ক ভিউ নামের একটি ১০তলা ভবনের পাঁচতলার ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে ওই ফ্ল্যাটেই লিমনের হাতে খুন হয় বিচারকের নবম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে তাওসিফ রহমান সুমন। আহত হন তার মা তাসমিন নাহার লুসী। হামলাকারী লিমন মিয়াও আহত হয়ে এখন হাসপাতালে।

স্পার্ক ভিউ ভবনের দারোয়ান মেসের আলী জানান, লিমন মিয়াকে তিনি আগে কখনও দেখেননি। বিচারককে ভাই পরিচয় দেওয়ায় তিনি তাকে ভেতরে ঢুকতে দেন। তবে তার আগে খাতায় তার নাম ও মোবাইল নম্বর লিখিয়ে নেন। হাতে একটি ব্যাগ নিয়ে দুপুর আড়াইটার দিকে ওই যুবক ফ্ল্যাটে যান। এর প্রায় ৩০ মিনিট পর ফ্ল্যাটের গৃহকর্মী তাকে এসে জানান যে, ফ্ল্যাটে বিচারকের ছেলেকে ও স্ত্রীকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। এরই মধ্যে ভবনের অন্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারাও চলে আসেন। তারা সবাই ফ্ল্যাটে ঢুকে তিনজনকেই আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর তিনজনকেই দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, ধারালো অস্ত্রের গুরুত্বর আঘাতের ফলে সুমনের মৃত্যু হয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত পাওয়া গেছে। লাশ হাসপাতালের মর্গে আছে।

ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, বিচারকের স্ত্রীর ডান হাত ও উরু এবং বাম বাহুতে গুরুত্বর জখম দেখা গেছে। এছাড়া তার ডান হাতের একটি রগ কেটে গেছে। চিকিৎসকদের একটি সমন্বিত দল অস্ত্রোপচার করেছেন। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তিনি জানান, লিমন মিয়ার ডান হাতে জখম ছিল। তবে সেটি গুরুত্বর নয়।

এদিকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। তিনি জানান, হামলাকারী ব্যক্তির পকেটে একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে তিনি চালক। তার সঙ্গে পূর্ববিরোধ থাকতে পারে। হাসপাতালে তাকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সার্বিক ঘটনা তদন্ত করছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশের সীমান্তের পাশে রাখাইনে জান্তার বিমান হামলায় ৫০ জন নিহত, জাতিসংঘের উদ্বেগ

১

আজ ফেনী যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, থাকছে একগুচ্ছ কর্মসূচি

২

নৌপথের ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

৩

রাজধানীতে পাঁচ বছরে আড়াই হাজার বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন

৪

৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে মন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ, জিএম বরখাস্ত

৫

কুষ্টিয়ায় রিভলভার ও ৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার

৬

প্রবাসীদের জন্য তাকওয়া ভিলেজে ২০ শতাংশ ছাড় শুরু

৭

দুই দশক পর ইরাক থেকে পুরোপুরি বিদায় নিল মার্কিন সেনারা

৮

উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা, দুই সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত

৯

রাজধানীতে আট মাসে ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন

১০

আমিরাতে নেতানিয়াহুর ছয় ঘণ্টার গোপন সফর, মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে আলোচনায় ‘ইরান’

১১

মার্কিন ও ইসরায়েলি ‘যুদ্ধাপরাধের’ বিচার নিশ্চিত করবে ইরান

১২

রাশিয়ায় আতশবাজির কারখানায় ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ১৪

১৩

রাশিয়ায় ১০ হাজার সেনা পাঠাচ্ছে উত্তর কোরিয়া, দাবি জেলেনস্কির

১৪

অক্টোবরে আসছে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি: রোসাটম

১৫

চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পৃক্ততা নেই: নজরুল ইসলাম খান

১৬

দক্ষিণের সীমানা পেরিয়ে এবার বাংলায় পা রাখল থালাপতি বিজয়ের দল

১৭

হরমুজ থেকে আরব সাগরে পিছু হটেছে শত্রুরা, সেখান থেকেও তাড়াব: মোজতাবা খামেনি

১৮

সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া এত বড় সাহস কারও নেই— ডা. শফিকুর রহমান

১৯

চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে গুরুত্ব আরোপ প্রধানমন্ত্রীর

২০