স্বর্ণ চোরাচালান রোধে অভিনব কৌশল হাতে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। গত মার্চ মাস থেকে সিঙ্গাপুর, দুবাই ও মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ তথ্যদাতা (ইনফরমার) নিয়োগ দিয়ে শুরু হয় নজরদারি কার্যক্রম। ফলে মাত্র কয়েক মাসেই স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের প্রধান হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
সূত্র জানায়, এসব ইনফরমার গোপনে চোরাচালানকারীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন এবং তাদের ছবি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমস ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছে সরবরাহ করেন। আগে চোরাচালানকারীরা সামান্য টাকার বিনিময়ে যাত্রীদের দিয়ে ১০০ গ্রাম বা তার নিচের স্বর্ণালংকার বহন করাতো—যা আইনি সীমার মধ্যে থাকায় সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া যেত না। কিন্তু ইনফরমারদের তথ্যের কারণে চক্রের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে সফল অভিযান চালানো সম্ভব হয়েছে।
গতকাল মালয়েশিয়ার বিমানবন্দরে চারজন স্বর্ণ চোরাচালানকারী গ্রেপ্তার হন, যা ইনফরমারদের দেওয়া তথ্যের ফলেই সম্ভব হয়েছে। ফলে সিঙ্গাপুর, দুবাই ও মালয়েশিয়ার বিমানবন্দর এখন প্রায় ‘ক্লিন’ ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (KLIA) টার্মিনাল-১ থেকে সোনা ও স্মার্টফোন পাচারের অভিযোগে চার বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে মালয়েশিয়ার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা সংস্থা (AKSES)।
একেপিএসের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্য ও এভিয়েশন সিকিউরিটি (AVSEC)-এর প্রোফাইলিংয়ের ভিত্তিতে যৌথ অভিযানে তাদের আটক করা হয়। অভিযানে জব্দকৃত পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য ১,৮৭,৭৪২.১০ রিঙ্গিত। এছাড়াও জব্দ হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে প্রায় ১,৬০,০০০ রিঙ্গিত মূল্যের সোনার তিনটি গয়না, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১২টি স্মার্টফোন (মূল্য ২২,৭০০ রিঙ্গিত), নগদ ৫,০৪২.১০ রিঙ্গিত এবং পাঁচটি আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে তিনজন ১৯৬৩ সালের ইমিগ্রেশন রেগুলেশনসের ৩৯(বি) ধারায় পাসের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে এবং অপর একজন বৈধ পাস বা পারমিট ছাড়া মালয়েশিয়ায় প্রবেশ ও অবস্থানের অভিযোগে ১৯৫৯/৬৩ সালের ইমিগ্রেশন অ্যাক্টের ৬(১)(গ) ধারায় অভিযুক্ত।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে- জেদ্দা, মদিনা ও মাস্কাট বিমানবন্দরে ইনফরমার নিয়োগের পরিকল্পনা চলছে। তবে কাজটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অভিজ্ঞ লোক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাবও করা হয়েছে, যাতে এ কাজে দক্ষ ও সাহসী ব্যক্তিদের নিয়োগ আরও সহজ হয়।

ঢাকা কাস্টমস হাউসের এক যুগ্ম কমিশনার বলেন, ‘যতদিন ইনফরমার নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকবে, ততদিন স্বর্ণ চোরাচালানকারীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
ঢাকা কাস্টমস কমিশনার মুহম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ইনফরমার নেটওয়ার্ক এখন স্বর্ণ চোরাচালান রোধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। যতদিন এই নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকবে, ততদিন স্বর্ণ চোরাচালানকারীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, চোরাচালান চক্র যতই চালাক বা প্রভাবশালী হোক, ইনফরমারদের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে টিকে থাকা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
একইসঙ্গে বিমানবন্দরে কাস্টমসের কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। ফলে কোনো চোরাচালানকারী স্বর্ণ নিয়ে এলে কাস্টমস কর্মকর্তাদের হাতে ধরা পড়ছে। সর্বশেষ, ৮.১২০ কেজি স্বর্ণ কাস্টমসের ভয়ে ফেলে পালিয়ে যায় চোরাচালানে জড়িত ব্যক্তি, যা পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে আটক করা হয়।
মন্তব্য করুন