জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনি রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন।
সাবেক আইজিপি মামুন তাঁর সাক্ষ্যে বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই নির্দেশনার কথা তাঁকে জানানো হয়েছিল তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মাধ্যমে।
তিনি আরো বলেন, ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার কাছ থেকে এই নির্দেশনার পরই দেশজুড়ে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা শুরু হয়।
ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম অনুযায়ী, সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি বা ঊর্ধ্বতনের নির্দেশনার দায়সহ জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলার বাকি দুই আসামি পলাতক। গ্রেপ্তার হওয়া মামুন দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন।
গতকাল তিনি মামলার ৩৬তম সাক্ষী হিসেবে বক্তব্য দেন।
সাক্ষ্যে মামুন বলেন, ‘সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও ডিবির তৎকালীন প্রধান হারুন অর রশিদ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। শেখ হাসিনা ও কামালের প্রত্যক্ষ নির্দেশেই অভ্যুত্থান দমনে গণহত্যা চালানো হয়।’
হাসিনা ও কামালের সরাসরি নির্দেশেই অভ্যুত্থান দমনে ‘গণহত্যা’ চালানো হয় উল্লেখ করে সাবেক আইজিপি সাক্ষ্যে বলেন, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পাশাপাশি জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, মির্জা আজম, হাসানুল হক ইনু এবং রাশেদ খান মেনন প্রধানমন্ত্রীকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন।
সাবেক আইজিপি বলেন, আন্দোলন দমনের কৌশল নির্ধারণে গত বছরের জুলাইয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ধানমণ্ডির বাসভবনে একাধিক কোর কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কারীদের আটক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এসব সভায়। প্রস্তাবটি এসেছিল ডিজিএফআই থেকে। শুরুতে তিনি এর বিরোধিতা করলেও পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে রাজি হন।
র্যাবের মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় কথিত ক্রসফায়ার, নির্যাতন ও আটক সংক্রান্ত ঘটনায় তিনি অবগত ছিলেন বলেও জানান মামুন। তবে এসব ঘটনায় কখনো তদন্ত করেননি বা তদন্তের উদ্যোগ নেননি বলে স্বীকার করেন। তাঁর মতে, এসব সিদ্ধান্ত আসে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে এবং চেইন অব কমান্ড অনুসরণ করা হতো না।
পুলিশপ্রধান হিসেবে লজ্জিত ও অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী
সাক্ষ্যে সাবেক আইজিপি জানান, গত বছরের ৫ আগস্ট সকাল থেকে তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে ছিলেন। সে সময় ঢাকা শহরে বিভিন্ন দিক থেকে ছাত্র-জনতা ঢুকতে শুরু করে। দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করবেন এমন খবর পান। বিকেলে আর্মির হেলিকপ্টারে তাঁকে ও অন্য কর্মকর্তাদের ক্যান্টনমেন্টে নেওয়া হয়। পরদিন ৬ আগস্ট তাঁর আইজিপি পদে নিয়োগ বাতিলের পর ৩ সেপ্টেম্বর ক্যান্টনমেন্ট থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমি লজ্জিত, অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী। আমার দায়িত্বকালীন ঘটে যাওয়া এই গণহত্যার দায় স্বীকার করছি। যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। ভিডিওতে যে ভয়াবহতা দেখেছি, তা আমাকে ভীষণভাবে আঘাত করেছে। আমি রাজসাক্ষী হয়ে সঠিক সত্য তুলে ধরতে চাই।’
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মামুনকে জেরা শুরু করেন আসামিপক্ষের রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মো. আমীর হোসেন। জেরা বুধবারও চলার কথা রয়েছে।
মন্তব্য করুন