বিশ্ব কেন ফিলিস্তিনিদের কান্না দেখতে পায় না? - সমকন্ঠ
রবিবার , ৪ অক্টোবর ২০২৬
সমকন্ঠ
৫ নভেম্বর ২০২৫, ৩:২০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বিশ্ব কেন ফিলিস্তিনিদের কান্না দেখতে পায় না?

গাজায় কোনো শান্ত রাত নেই; যুদ্ধবিরতির আগেও নয়, শার্ম আল শেখে শান্তি ঘোষণার পরেও নয়। অবরোধ শিথিল করলেও ক্ষুধা-তৃষ্ণায় মারা যাচ্ছে নিরীহ অসহায় ফিলিস্তিনি নারী-শিশুরা।

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক শান্তি আলোচনা ও মধ্যস্থতাকারী সাংবাদিক ‘লাবনা মাসারোওয়া’র একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।

ওই নিবন্ধে তিনি লিখেছেন— মিশরের সমুদ্রতীরবর্তী রিসোর্ট শার্ম-আল-শেখে যখন বিশ্ব নেতারা হাসছিলেন এবং গাজায় যুদ্ধের সমাপ্তি সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে করমর্দন করছিলেন, তখন ইসরাইলি সেনাবাহিনী থেমে থেমে গাজায় বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছিল; যেন তারা নিঃশ্বাস নেওয়ারও বিরতি দিতে চায়নি।

যুদ্ধবিরতির ঠিক একদিন পরেই ইহুদিবাদী সরকার ১০৪ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে; যার মধ্যে ৪৬ জন শিশু এবং একই পরিবারের ১৮ জন সদস্য রয়েছে। নিহতদের অনেকের নামও জানা যায়নি; তারা নীরবে এবং বেনামে শহীদ হয়েছেন।

বিশ্বের কাছে, ফিলিস্তিনিরা আর মানুষ নেই; তারা আবেগহীন, অতীতহীন, গল্পহীন এবং ভবিষ্যৎহীন প্রাণী হয়ে উঠেছে। ইসরাইলি গণমাধ্যম তাদের বন্দীদের জীবন সম্পর্কে, তাদের প্রিয় খাবার থেকে শুরু করে পরিবারের কাছে ফিরে আসার মুহূর্ত পর্যন্ত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করলেও, গাজার শহীদ শিশুদের জন্য কেউ চোখের জল ফেলে না।

যুদ্ধবিরতির দিন, ইসরাইলি টেলিভিশন একটি দৃশ্য সম্প্রচার করে; একজন ইসরাইলি বন্দির স্ত্রী তার পাঁচ বছরের ছেলেকে জাগিয়ে তুলে বলেন, তার বাবা ফিরে এসেছেন। এ সময় টিভি উপস্থাপকদের চোখে পানি ছিল। কিন্তু একই দিনে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বন্দিদের বাড়িতে অভিযান চালায়; যারা সেদিনই মুক্তি পেতে যাচ্ছিল। পরিবারগুলোকে হুমকি দেওয়া হয় যে, তাদের প্রিয়জনকে মুক্তি দেওয়া হলেও তাদের আনন্দ উদযাপন করার কোনো অধিকার নেই।

এক ফিলিস্তিনি বন্দির মেয়ে রাজান বলেন, সৈন্যরা আমাদের বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে, আমাদের হুমকি দিয়েছে এবং কাউকে আমার বাবাকে অভিনন্দন জানাতেও দেয়নি! ওই অভিযানে এক যুবক আহত হয় এবং আরও বেশ কয়েকজনকে মারধর করা হয়।

হাইসাম সালেম নামে গাজার এক ফিলিস্তিনি বন্দি তার মুক্তির পর জানতে পারেন যে, তার স্ত্রী এবং তিন সন্তান ইসরাইলি হামলায় শহীদ হয়েছেন। হাসপাতালে গিয়ে তিনি চিৎকার করে বললেন, আমার বাচ্চারা কি বেঁচে আছে? না… তারা মারা গেছে। অথচ আমার মেয়েটার জন্মদিন ছিল চার দিন পরে।

তিনি কারাগারে বসে তার মেয়ের জন্য একটি ব্রেসলেটটি তৈরি করেছিলেন। সেটি তুলে ধরে বললেন, আমি এটা তার জন্য তৈরি করেছি, নিজের হাতে।

হাইসাম সালেমের মেয়েটি তার ছেলের সমান বয়সি ছিল। কয়েকদিন আগে ছেলেটি তার জন্মদিন উদযাপনও করেছিল। কিন্তু তার এখন কেউই জীবিত নেই। সেই সঙ্গে পরিবার-পরিজন হারানো সালেমের জন্য কেউ এক ফোঁটা চোখের পানিও ফেলল না এবং তার মুক্তিকে স্বাগত জানাতেও কেউ বাকি রইল না।

ইসরাইল যখন তার ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ নিয়ে কথা বলছে, তখন কেউ গাজা বা পশ্চিম তীরের মানুষকে রক্ষা করছে না। এমনকি ২০,০০০ শিশুসহ ৬৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির জীবনও বিশ্বকে নাড়া দিতে যথেষ্ট নয়।

যে ইসরাইল এক রাতে বোমা মেরে শত শত মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে। সেই ইসরাইল আক্রমণের আগে কেবল যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করে এবং পরের দিন শিশুদের লাশ দাফন করার আগেই আবার ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা দেয়।

অন্যদিকে শার্ম আল-শেখ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরকারী সরকারগুলো ফিলিস্তিনিদের পরামর্শ দেয় যে, স্বাধীনতা অর্জনের একমাত্র উপায় হলো আলোচনা, প্রতিরোধ নয়। কিন্তু ইসরাইল দেখিয়েছে যে তারা কোনো চুক্তি মেনে চলবে না।

এদিকে গাজায় ‘যুদ্ধোত্তর’ একটি নতুন মডেল রূপ নিচ্ছে; ইসরাইল দ্বারা পরিকল্পিত এবং আরব ও মুসলিম নেতাদের দ্বারা অনুমোদিত একটি মডেল, যেখানে ট্রাম্পের সঙ্গে হাসিমুখে করমর্দন করা হবে। এই মডেলে ‘প্রতিরক্ষার অধিকার’ কেবল ‘জানার অধিকার’-এর স্থানে প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

যার অর্থ বাস্তবে ইসরাইল যখনই চাইবে তখনই ফিলিস্তিনিদের হত্যা করবে, তবে নিরীহ ফিলিস্তিনিরা কিছু করা তো দূরে থাক, বলতেও পারবে না।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পাত্রীদের নিকাব পরার শর্ত দিয়েছিলাম, কেউ রাজি হয়নি, পাইলট শুনে সবাই রাজি

১

হঠাৎ ‘অস্বাভাবিক’ গোপন বৈঠক ট্রাম্পের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের

২

ছোট ভাইয়ের হাঁসুয়ার কোপে বড় ভাই নিহতের অভিযোগ, তবে পরিবারের দাবি ভিন্ন

৩

মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদে আত্মঘাতী হামলার গুজব, আটক ১

৪

বাংলাদেশের সীমান্তের পাশে রাখাইনে জান্তার বিমান হামলায় ৫০ জন নিহত, জাতিসংঘের উদ্বেগ

৫

আজ ফেনী যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, থাকছে একগুচ্ছ কর্মসূচি

৬

নৌপথের ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

৭

রাজধানীতে পাঁচ বছরে আড়াই হাজার বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন

৮

৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে মন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ, জিএম বরখাস্ত

৯

কুষ্টিয়ায় রিভলভার ও ৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার

১০

প্রবাসীদের জন্য তাকওয়া ভিলেজে ২০ শতাংশ ছাড় শুরু

১১

দুই দশক পর ইরাক থেকে পুরোপুরি বিদায় নিল মার্কিন সেনারা

১২

উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা, দুই সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত

১৩

রাজধানীতে আট মাসে ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন

১৪

আমিরাতে নেতানিয়াহুর ছয় ঘণ্টার গোপন সফর, মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে আলোচনায় ‘ইরান’

১৫

মার্কিন ও ইসরায়েলি ‘যুদ্ধাপরাধের’ বিচার নিশ্চিত করবে ইরান

১৬

রাশিয়ায় আতশবাজির কারখানায় ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ১৪

১৭

রাশিয়ায় ১০ হাজার সেনা পাঠাচ্ছে উত্তর কোরিয়া, দাবি জেলেনস্কির

১৮

অক্টোবরে আসছে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি: রোসাটম

১৯

চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পৃক্ততা নেই: নজরুল ইসলাম খান

২০