১৮০ দিনে বিচার না হলেও নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা বাতিল হবে না: হাইকোর্ট - সমকন্ঠ
বুধবার , ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সমকন্ঠ
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

১৮০ দিনে বিচার না হলেও নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা বাতিল হবে না: হাইকোর্ট

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলেও মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল হবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়, বরং নির্দেশনামূলক। ফলে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও শুধু এ কারণে কোনো মামলার বিচারপ্রক্রিয়া অকার্যকর হবে না।

মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল বনাম রাষ্ট্র মামলায় এ রায় দেন হাইকোর্ট। ইডেন কলেজের এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে ২০২৩ সালের ৭ জুন রায় দেন বিচারপতি কে. এম. কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ। সম্প্রতি রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

রায়ে আদালত বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করতে না পারার কারণে কোনো মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল করার বিধান নেই। তাই এ সময়সীমা পার হয়ে গেলেই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হয়ে যাবে না।
আদালত আরও বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের জন্য একটি নির্দেশনা। তবে ওই সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হলে মামলার বিচার বন্ধ বা বাতিল হওয়ার মতো কোনো আইনগত পরিণতি আইনে নির্ধারিত নেই।

মামলার পটভূমি

প্রকাশিত রায়ের বিবরণে জানা যায়, কলেজে যাওয়া-আসার সূত্রে আসামি পাভেলের সঙ্গে ইডেন কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ২০ বছর বয়সী এক ছাত্রীর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। ২০০৭ সালের ৮ জুলাই পাভেলের সঙ্গে একটি বাসায় যাওয়ার পর বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে পাভেল ওই শিক্ষার্থীকে একাধিকবার ধর্ষণ করলে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পরে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয়।

ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর শ্যামপুর থানায় পাভেলসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগীর মা। তদন্ত শেষে পুলিশ আসামি মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার ১-নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয় এবং ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই আদালত আসামি পাভেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। তবে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে অভিযোগ অস্বীকার করেন পাভেল।

পরবর্তীতে আসামি পাভেল ২০১১ সালের ৮ মে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে দাবি করে বলেন, বিচারের জন্য এই মামলার নথি ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই ট্রাইব্যুনালে নথিভুক্ত হওয়ার পরও নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হয়নি। নারী ও শিশু নির্যাতন আইন, ২০০০-এর ২০ ধারা অনুযায়ী মামলা গ্রহণের ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

পাভেলের দাবি, বিচারে জন্য মামলাটির নথি ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই তারিখে ট্রাইব্যুনালে গৃহীত হয়, কিন্তু ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারি তারিখের ৩৪ নম্বর আদেশ থেকে দেখা যায় যে, মামলাটির কার্যক্রম এখনও (২০১১ সালের ৮ মে) ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। যা ২০০০ সালের আইনের ৩১ক ধারার লঙ্ঘন।

এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে আইনের ৩১ক ধারা অনুযায়ী বিচার শেষ না হওয়ার কারণ উল্লেখ করে ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল, পাবলিক প্রসিকিউটর ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার বিধান থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। পাভেলের দাবি, আইন লঙ্ঘন করে বিচার কার্যক্রম চলতে পারে না। পাভেল বিচার স্থগিতের জন্য আবেদন করলে হাইকোর্ট মামলার বিচারিক কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করে এবং পরে সময়ে সময়ে তা বর্ধিত করা হয়।

পরবর্তীতে হাইকোর্ট উভয়পক্ষের যুক্তি পর্যালোচনা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা বিশ্লেষণ করে আসামি পাভেলের রিটের প্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে ২০২৩ সালের ৭ জুন রায় দেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট রুলটি খারিজ করেন। আদালত বলেন, মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকার যে দাবি রিটে করা হয়েছে, তা সঠিক নয়। রায়ে আদালত আরও উল্লেখ করেন, রিটকারী ২০১০ সালের ৭ নভেম্বরের পরবর্তী আদেশগুলো গোপন করেছেন, যা আদালতের কাছে অসৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

আদালত বলেন, মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করার পক্ষে যে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে, তা রিটকারীর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নয়। কারণ এ বিষয়ে রিটকারীর পক্ষে কোনো আইনগত অধিকার সৃষ্টি হয়নি।

সার্বিক তথ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও আইনের বিধান বিবেচনায় রুলের কোনো সারবত্তা নেই উল্লেখ করে হাইকোর্ট তা খারিজ করেন। একই সঙ্গে আগে দেওয়া মামলার বিচারিক কার্যক্রমের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল করা হয়।

আদালতে পাভেলের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এম. এইচ. রশীদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান (জামান) ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. শফিকুজ্জামান (রানা)। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরী।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মামদানির হু’মকি ও গ্রেপ্তারের ভয়ে জেএফকে বিমানবন্দরে নামছেন না ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী

ভারত থেকে ইলিশ আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ, ১০৩ এনওসি বাতিল

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল হলে দেশের বাজারেও কমানোর ইঙ্গিত প্রতিমন্ত্রীর

বাস ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

১৮০ দিনে বিচার না হলেও নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা বাতিল হবে না: হাইকোর্ট

নেতানিয়াহু ‘যুদ্ধাপরাধী’ ও ‘গণহত্যার স্থপতি’: মামদানি

সাংবাদিক হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান আসামি গ্রেপ্তার, ২৪ ঘণ্টায় জামিন পেলেন এমপির চাচা-পিএস

রাবি শিক্ষার্থী মারধরের ঘটনায় ৪ রেলকর্মী সাময়িক বরখাস্ত

রাজশাহী স্টেশনে শিক্ষার্থীকে মারধরে সম্পৃক্ততা নেই আনসারের

সিরিয়ার সামরিক ঘাঁটিতে শক্তিশালী বিস্ফোরণ

১০

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবকে ‘ভূমিকম্প’ বললেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী

১১

এবার প্রতি লিটারে জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বাড়াল সরকার

১২

রাজধানীতে ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫২৭, মামলা ৫৫

১৩

ইসরায়েলকে ৪০ হাজার বোমা বিক্রির অর্থায়ন আটকে দিলেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা

১৪

পাকিস্তানে মসজিদে বোমা হামলায় নিহত বেড়ে ২৭

১৫

দুদক পুনর্গঠন করে এনসিপি ও বিরোধী দলকে টার্গেট করা হচ্ছে: নাহিদ ইসলাম

১৬

ইরানকে ‘নির্মূল’ করবো নাকি করবো না সিদ্ধান্ত আসছে: ট্রাম্প

১৭

যুক্তরাষ্ট্র থেকে গানভরের প্রথম এলএনজি কার্গো এলো দেশে

১৮

ঝটিকা মিছিল আতঙ্কে পুলিশ কর্মকর্তারা

১৯

মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ৫ মিনিটের কলে চাকরি গেল ভারতের ৮০ কর্মীর!

২০